রিপন কুমার দে: একজন মানুষের অনেক স্বপ্ন থাকে। তা ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা প্রা্য় সবার মনেই থাকে। কেউ এতে সফল হয়, কেউবা ব্যর্থ। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ছাত্রেরও অনেক সাধনা থাকে স্বপ্ন পূরণের। তারই লক্ষ্যে হয়তো তার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েই হয়তো ঝাপিয়ে পড়বে স্বপ্নকামী ব্যক্তিটি। কিন্তু কখনও কখনও এতে ছেদ পড়ে বিভিন্ন অশুভ বাধায়। যে বাধা পেরুতে পারলে হয়তো পূরণ হয়ে যেতে পারে স্বপ্নকামী ব্যক্তিটির স্বপ্নযাত্রা। আমাদের লতিফ আহমেদ তেমনি একজন স্বপ্নকামী ভাই।

লতিফ আহমেদ মাদারীপুরের কালকিনি থানার পরিপত্তর গ্রামের হতদরিদ্র এক কৃষক পরিবারের মেধাবী সন্তান। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে দ্বিতীয়। সামান্য কিছু এক-ফসলি জমি ছিল তাদের যেটার চাষাবাদ থেকেই কোনমতে চলছিল বাবা-মা আর তিন ভাই বোনের সংসার। কিন্তু এই কোনমতে বেঁচেবর্তে থাকাটাও একসময় নিয়তির আর সহ্য হলনা। কৃষক বাবা মাইনুদ্দীন ঢালী তাঁর সন্তানের মেধা প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই ১৯৮৯ সালে হঠাৎ একদিন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেলেন।

গৃহিণী মা আসিয়া খাতুন তিন সন্তানকে নিয়ে পড়লেন অথৈ সাগরে। এরকম অবস্থায় এদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা হয় আসিয়া খাতুন তা হতে দিলেননা। খড়কুটোর মত ভেসে যেতে দিলেননা সংসারটাকে। ভাইদের সামান্য সহযোগীতা আর যা কিছু জমি-জিরেত ছিল তা দিয়েই সংসারটাকে চালিয়ে নেয়ার কঠোর সংগ্রামে নামলেন তিনি।

ছেলেকে স্কুলে দিলেন, বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর মেয়েটা সক্ষম হল কিছু অর্থযোগান দিয়ে মায়ের সংসারটাকে একটু গতিশীল করতে। একসময় ছোট মেয়েটাকেও বিয়ে দিলেন। এবং ততদিনে লতিফের মেধা প্রস্ফুটিত হতে শুরু করেছে। মা আশায় বুক বাধলেন, ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলার আরেক সংগ্রামে নামলেন তিনি। বড় মেয়েটার সাহায্যের হাতও প্রসারিত হল একই আশায়।

তাঁরা স্বপ্ন দেখলেন লতিফ একদিন পড়ালেখা শিখে অনেক বড় হবে, মস্ত বড় চাকরী পাবে, তাঁদের কষ্টের দিন শেষ হবে। লতিফও সেই প্রত্যয় নিয়েই তরতরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকল। কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক স্কুল পার হল, উচ্চ মাধ্যমিক পার হল, উচ্চ শিক্ষার্থে ভর্তি হল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে, ২০০৩-০৪ সেশনে। তরতরিয়েই এগিয়ে যেতে থাকল লতিফ, যথাসময়ে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হল। মায়ের স্বপ্ন প্রসারিত হতে থাকল। ডিসেম্বরে (২০১০) ফাইন্যাল পরীক্ষা, আর তো মাত্র কয়েকটা মাস, এরপর ছেলে পাশ করে বের হয়ে চাকরী করবে, মায়ের সব কষ্ট ঘোচাবে।

মাস্টার্স ফাইন্যাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই লতিফ ঘন ঘন অসুস্থ হতে শুরু করে। মামুলী জ্বর, ব্যাক পেইন, পাত্তা দেয়না। অসুস্থ অবস্থাতেই পরীক্ষা দেয়, পড়ালেখা পর্ব শেষ হয় ২৮ শে ডিসেম্বর ২০১০, এবার সময় হল মায়ের কষ্ট ঘোচাবার।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে দেখে দরখাস্ত করা শুরু করে, কিন্তু অসুস্থতাটাতো আর কমছেই না, বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। স্মরণাপন্ন হয় স্থানিয় ডাক্তারের, কিছু পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর ডাক্তার সাহেব তাকে মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ডা. পারভীন সাইদা আক্তারের কাছে যেতে বলে। এবার লতিফ ঘাবড়ে যায়। কিন্তু যেতেতো হবেই।

ডা. সাইদা আরো কিছু পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর নিশ্চিত হন লতিফ মরণব্যাধি রেকটাম (Adenocarcinoma) ক্যান্সারে আক্রান্ত। লতিফকে তিনি ভর্তি করে নেন তখনই। মা ছুটে আসেন গ্রাম থেকে, ডাক্তাররা তাঁকে পরামর্শ দেন উন্নত চিকিৎসার জন্য ছেলেকে জরুরীভিত্তিতে কলকাতার ঠাকুরপুকুরের Cancer Centre Welfare Home & Research Institute নিয়ে যেতে। খরচের ব্যাপারে ধারনা দেন ৬ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।

এ অবস্থায় ৫৫ বছরের বৃদ্ধ মায়ের অধিক শোকে পাথর বা টাকার অভাবে দিশাহারা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ভুলে যাননি ১৯৮৯ এর সেই সংগ্রামের শুরুর দিনগুলোর কথা, ভুলে যাননি দীর্ঘ বাইশটি বছরের সংগ্রামী জীবনের কথা। তিনি ভেঙে পড়লেননা। তিনি উঠে দাড়ালেন। গ্রামে গিয়ে সবটুকু জমি বন্ধক রেখে এক লাখ টাকা যোগাড় করে ঢাকায় ফিরলেন।

এর মধ্যেই খবর পেয়ে ছুটে এলো লতিফের সহপাঠি আর জুনিয়র কিছু নিবেদিতপ্রাণ ছাত্র-ছাত্রী। মাকে নিশ্চয়তা দিল লতিফের চিকিৎসার খরচা যেভাবেই হোক তারা জোগাড় করবে। লতিফকে তারা সুস্থ করে তুলবেই। নাদিম, বাপ্পি, মামুন, রুবেল, মালেকসহ অনেকেই নেমে পড়লো রাস্তায়। সাহায্যের আকুল আবেদন নিয়ে ছুটে গেল ডিপার্টমেন্ট থেকে ডিপার্টমেন্টে। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের দৈনন্দিন খরচা বাঁচিয়ে এগিয়ে এলো লতিফকে বাঁচাতে।

অলরেডি ওরা প্রায় ৩ লাখ টাকা জোগাড় করে ফেলেছে দেখে আমরা অবাক ও অবিভুত হয়েছি। লতিফকে অলরেডি ওরা মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে রিলিজ করিয়ে কলকাতার ঠাকুরপুকুরের Cancer Centre Welfare Home & Research Institute এ ভর্তি করিয়েছে। সেখানে লতিফের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। টিউমারটা আকারে অনেক বড় হয়ে যাওয়ায় ডাক্তাররা তাকে সরাসরি অপরেশন টেবিলে নিতে পারছেনা। রেডিওথেরাপী আর কেমোথেরাপী দিয়ে টিউমারটা আকার ছোট করে আনার চেষ্টা চলছে এখন। সপ্তাহে ৫ দিন রোজ একটা করে রেডিওথেরাপী দিচ্ছে, চলবে ৫ সপ্তাহ অর্থাৎ মোট রেডিওথেরাপী দিতে হবে ২৫ টি। একই সাথে (সকাল-বিকাল) কেমোথেরাপীও দিচ্ছে। মোট কেমোথেরাপী দিতে হবে ১০ টি, প্রথম সপ্তাহে ৫ টি আর পঞ্চম সপ্তাহে ৫ টি। পাশাপাশি চলবে প্রতি সপ্তাহে একবার করে রক্ত পরীক্ষা। কোর্স শেষ হলে বসবে মেডিকেল বোর্ড। পর্যালোচনা সিদ্ধান্ত নিবে অপরেশন করতে পারবে নাকি থেরাপী চালিয়ে যাবে।

কিন্তু ১০ লাখ টাকাতো অনেক টাকা। এত টাকা ওরা ছোট্ট পরিসরের এই ক্যাম্পাস থেকে কিভাবে জোগাড় করবে। অনেক আগেই ওরা ৩ লাখ টাকা জোগাড় করে ফেলেছে, এটাইতো অনেক বেশি মনে হচ্ছে। ওরা যা করেছে তার জন্য স্যালুট জানাই। ইতিমধ্যে প্রায় ৭ লাখ জোগাড় হয়ে গিয়েছে। বাকি ৩ লাখ টাকা জোগাড় করতে এবার আমাদের মতো উপার্জনক্ষমদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। ৩ লাখ টাকা কি আমাদের জন্য অনেক বেশি টাকা। ১ হাজার টাকা করে দিলে মাত্র ৩০০ জনে হয়ে যায়। যারা সদ্য চাকরী বা ব্যাবসাতে ঢুকছে তাদেরকে বাদ দিলাম, যারা দুই বছর বা তার বেশি সময় আগে থেকে চাকরী বা ব্যাবসা করছে তাদের জন্য ১ হাজার টাকা করে দেয়াটা কঠিন না বলেই আমার বিশ্বাস। আর যারা পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় আগে থেকে চাকরী বা ব্যাবসা করছে তাদের জন্য ২ হাজার টাকা করে দেয়াটা মোটেই কঠিন হওয়ার কথা না। আমি নিজে ৩ হাজার টাকা দেয়ার অঙ্গিকার করলাম, সোমবারে পৌছে যাবে। এই হিসেবে মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ জন সাহায্যের হাত বাড়ালেই বেঁচে যাবে একটা টগবগে প্রাণ, বেঁচে যাবেন একজন সংগ্রামী ‘মা’, বেঁচে যাবে একটা পরিবার।

টাকা-পয়সার ব্যাপারে সবসময় সর্বোচ্চ বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরী। তাই এটা নিশ্চিত করতে এগিয়ে এসেছে শাবি কর্তৃপক্ষ। ছাত্রকল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস এবং পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক রহমত আলীর যৌথ সিগনেটরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালী ব্যাংকে “Help Fund” নামে একটা অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, অ্যাকাউন্টটা যৌথভাবে পরিচালিত হবে এবং সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা রক্ষার জন্য কিছুদিন পরপর ব্যাংক স্টেটমেন্ট ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সামনে তুলে ধরা হবে। এই ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজারও একজন SUSTian, তার নাম হিমাংশু আচার্য, Sociology ১ম ব্যাচের ছাত্র ছিলো। সে এব্যাপারে সবরকম সহযোগীতা করবে।

বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা লতিফের জন্য ইতিমধ্যেই যা করেছে তা অভাবনীয়, লতিফকে বাচাঁতে আমাদের কিছু করার এটাই সর্বোচ্চ সময়। আমরা কি পারবোনা বাকি টাকাটা যোগাড় করে সুষ্ঠ চিকিৎসার মাধ্যমে লতিফকে সুস্থ করে তুলতে? আমরা কি পারবোনা টগবগে সেই তরুণটির মধ্যে আবারো তারুণ্য ফিরিয়ে আনতে? নিশ্চই পারবো, পারতেই হবে।

বি: দ্র: এই পোস্টটি লিখতে আমাদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিটু ভাইয়ের তথ্যই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

আমারব্লগের আমার ফাউন্ডেশনের পাশাপাশি “মানবতার পাশে শৈলীিও লতিফ আহমেদ এর চিকিতসার্থে এগিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সকল শৈলারদের সাথে নিয়েই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে লতিফের দিকে।

১) অনলাইনে প্যে-পালের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত হতে admin@ amarfoundation. org .uk ঠিকানায় চ্যারিটির অর্থ পাঠানো যাবে।

২) নিম্নোক্ত একাউন্টে ব্যাংকের মাধ্যমে পৃথিবীর যে কোন দেশ হতে চ্যারিটির অর্থ পাঠানো যাবেঃ

Account Name: Amar Foundation Limited
Account Number: 02248549
Sort Code: 40-05-16
Bank Name: HSBC
Branch Adress:
196 Oxford Street
London W1D 1NT
United Kingdom

৩) ডেবিট অথবা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করতে চাইলে নিচের লিঙ্ক ফলো করুন।

যারা বাংলাদেশে আছেন সবাইকে অনুরোধ করবো সরাসরি ইউনিভার্সিটির ‘’ হেল্প ফান্ড’’ একাউন্টে টাকা কন্ট্রিবিউট করতে।

Account Name: Help Fund
Saving Account Number: 34062068
Bank: Sonali Bank Limited
Branch: Shahjalal University of Science and Technology, Sylhet, Bangladesh
Swift Code: BSONBDDHDGT

If you need to contact with the signatories, their phone numbers are as below:

Professor Dr Muhammad Younus, Dept of Chemistry, phone# 716131, ext 260, emailmyounus-che@sust.edu

Professor Dr Rahmat Ali, Dept of Statistics, phone# 2831573, ext 418, email: ralistat@sust.edu

এছাড়াও “মানবতার পাশে শৈলী” এর কাছে ই-মেইল করতে হলে নিচের ঠিকানায় ই-মেইল করুন:

shoilyblog@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *